এহসান এস প্রতারকদের পকেটে যশোরের ১৬ হাজার গ্রাহকের ৩শ’ কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : ধর্মীয় লেবাসে প্রতারণার শীর্ষে অবস্থানকারী মাল্টিপারপাস এহসান এস বাংলাদেশের প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে মানবে তর জীবন যাপন করছেন যশোরাঞ্চলের ১৬ হাজার লগ্নিকারী। ঢাকায় কেন্দ্রীয় গ্রুপ চেয়ারম্যান গালিব আহসান আটক হওয়ার পর তথ্য মিলেছে, যশোরের হতভাগ্য গ্রাহকদের প্রায় ৩শ’২২ কোটি টাকা রয়েছে ওই প্রতারক চক্রের দখলে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে শ’ শ’ গ্রাহক ও লগ্নিকারী নানা রোগে ও টাকার শোকে এখন শয্যাশায়ী। কেউবা ক্যান্সারে আক্রান্ত, কেউবা প্যারালাইজডে ভুগছেন। কেউবা দিনের পর দিন আহজারি করে চলেছেন ওই টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। সব মিলিয়ে চোখের জলে সময় কাটছে অধিকাংশের। প্রতারকদের প্রতি নানা অভিশাপ দিয়ে আল্লাহর উপর বিচার ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। আবার করুন আহাজারি করে শেষ সম্বল বিক্রি করে দেয়া টাকা ফেরতও চাইছেন তারা। ১৬ হাজার লগ্নিকারীর মধ্যে একজন যশোর শহরের পুরাতনকসবা শহীদ মশিউর রহমান সড়কের মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে বৃদ্ধ আফসার উদ্দিন (৬০)। ইসলামী নানা বুলিতে পড়ে এহসানকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা লগ্নি করেন সেই ২০১৩ সালে। তিনি জানান, তিনিসহ ১৬ হাজার গ্রাহককে পথে বসিয়ে ২০১৪ সালে লাপাত্তা হয় এহসান এস যশোর অফিস। সেই থেকে টাকা ফেরত পেতে সব মহলে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কিন্তু টাকা ফেরত পাননি। এখন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত, বিছানায় শয্যাশায়ী। কান্নায় ভেঙে পড়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আধো আধো করে জানালেন টাকার ওভাবে ওষুধ কিনতে পারছেন না। প্রলোভনে পড়ে সর্বস্ব তুলে দিয়েছিলেন ওদের হাতে। এখন তার কান্না ছাড়া কেনো পুঁজি নেই। মহান আল্লাহর উপর তিনি বিচার ছেড়ে দিয়েছেন। শয্যাশায়ী বৃদ্ধ আফসার উদ্দিনের আহাজারিতে আরো তথ্য মেলে, তার মতই আরো ৫ বৃদ্ধ বৃদ্ধা মাথাপ্রতি ৩ থেকে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লগ্নি করে আজ কঠিন সময় পার করছেন। সংসারের সব খুইয়ে লগ্নি করে আজ দু’মুঠো ভাতের নিশ্চিয়তা নেই তাদের। এহসানের প্রতারকদের প্রতি অভিশাপ আর আহজারিতে তাদের সময় কাটছে। চাঁচড়ার রাজা বরদাকান্ত রোডের মৃত আব্দুল হকের স্ত্রী আম্বিয়া (৬০), ঝুমঝুমপুর মুক্তিযোদ্ধা কলোনীর মৃত আব্দুস সামাদের স্ত্রী রহিমা খাতুন (৬৫), রুপদিয়ার মৃত শের আলীর ছেলে নুর ইসলাম (৬০), বাঘারপাড়া ঘোষ নগরের শরৎ চন্দ্রের স্ত্রী শেফালী রানী শীল (৬৫) ও একই গ্রামের সুব্রত অধিকারীর স্ত্রী দূর্গা রানী অধিকারী (৬০) জানান, তারা হয়তো প্রতারক চক্রের বিচার দেখে যেতে পারবেন না। তবে পালের গোদা আটক হয়েছে শুনে খুশি হলেও তারা বেঈমান চক্রের সেই মূফতি আবু তাহের নদভীসহ সব সহযোগীর কঠিন শাস্তি চেয়েছেন। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া ওই বৃদ্ধ বৃদ্ধাগণ জানান, তাদের যারা চোখের জল ঝরিয়েছে তারা যেন সম পরিমাণ সাজা পায়।

এহসান এস বাংলাদেশের যশোরাঞ্চলের কার্যক্রম নিয়ে খোঁজখবর নিলে তথ্য মিলেছে, কার্যত ২০০৮ সালে প্রতারণার বুলি আওড়িয়ে যাত্রা শুরু করে এহসান ইসলামী মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটি এবং এহসান ইসলামী রিয়েল এস্টেট লিমিটেড। যশোরে এর শাখা খুলে ২০১২ সালে প্রতারণায় লিপ্ত হয় সংঘবদ্ধ চক্র। মূলত এহসান এস বাংলাদেশ, এহসান রিয়েল এস্টেট এবং এহসান মাল্টিপারপাস শরিয়া মোতাবেক সুদ বিহীন ব্যবসার ধুয়ো তুলে মাসে এক লাখে ১৬শ’ টাকা মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা জমা নিতে থাকে। এ কাজে যশোরের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাধ্যমে শরিয়া মতে ব্যবসার কথা বলে এবং ইহকাল পরকালের কথা বলে সাধারণ মানুষকে তাদের ব্যবসায় জড়িত হতে উদ্বুদ্ধ করে। সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে তাদের গচ্ছিত কাড়ি কাড়ি টাকা ব্যবসায় লগ্নি করে। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লভ্যাংশ ও বিনিয়োগের টাকা ফেরত না দিয়ে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে পালিয়ে যায়। ওই সময় গ্রাহকদের টাকা আদায় আন্দোলন কমিটি করা হয়। হিসেব জড়ো হয় প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার। আর সারা দেশে আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য মেলে।

সর্বশেষ সারা দেশে এহসান গ্রুপের সব শাখা মিলে ১৭ হাজার কোটি টাকা ও যশোরাঞ্চলের ৩শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ ধরা পড়ে। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে কখনও বন্ধ, কখনও খোলা অবস্থায় রেখে একে একে গা ঢাকা দেয় ওই প্রতিষ্ঠানের এমডি পর্যায়ের পাঁচ জন। গ্রাহকদের টাকা আজ দেব কাল দেব বলে তালবাহানা শুরু করলে নানা বিপাকে পড়েন লগ্নিকারীরা। এক পর্যায়ে সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে গা ঢাকা দেয় অর্ধশত কর্মচারীসহ ওই পাঁচ এমডি। এ ঘটনায় রাস্তায় নেমে পড়েন বিশাল অংকের টাকা লগ্নিকারীরা। যশোরাঞ্চলের ১৬ হাজার লগ্নিকারীর মাথায় হাত ওঠে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করা হয়। হয় মামলা, তদন্তে মাঠে নামে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা, সিআইডি, পিবিআই ও পুলিশ। তদন্তে অভিযোগের শতভাগ সত্যতাও মেলে।

৯ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর তোপখানা থেকে র‌্যাবের গোয়েন্দা সেল আটক করে এহসানের এক ডজন গ্রুপের চেয়ারম্যান মুফতি গালিব আহসান ও তার খয়ের খাঁ আবুল বাশার খানকে। আটকের পর ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে গ্রাহকদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেলে উপরে উল্লেখিত ছয় বৃদ্ধের করুন অবস্থাসহ আরো ভয়ংকর সব তথ্য মেলে। যশোরাঞ্চল থেকে ৩শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় এহসান গ্রুপের এহসান এস বাংলাদেশ ও রিয়েল এস্টেটের চেয়ারম্যান নামধারী চট্টগ্রামের মুফতি আবু তাহের নদভীসহ ২৭ প্রতারকের নাম বেরিয়ে এসেছে। অন্যরা হচ্ছে, এহসান এস এর ব্যবস্থাপক শিমুলিয়ার আতাউল্লাহ, প্রধান নির্বাহী ব্যবস্থাপক মাগুরার কাজী রবিউল ইসলাম, অর্থ মহাব্যবস্থাপক মাগুরার মুফতি জুনায়েদ আলী, মহা ব্যবস্থাপক প্রশাসন সাতক্ষীরার মুফতি আমিনুল হক ওরফে আমজাদ হোসেন, পরিচালক আজিজুর রহমান, মঈন উদ্দিন, আমিনুল হক, আব্দুল মতিন, কালিমুল্লাহ, মিরাজুল ইসলাম, খুলনার মুফতি গোলাম রহমান, মাঠকর্মী যশোরের বাবর আলী, সেলিমুল আজম চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, শামসুর রহমান, মকছেদ আলীসহ অর্ধশত ব্যক্তি।

এ অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে বিশাল অংকের ওই টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করায় এমডি নামধারী রবিউল ইসলাম, খরিরুজ্জমান, জুনায়েদ আলী, ইউনুস আলী ও আতাউল্লাসহ ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন মহলে অভিযোগও দেয়া হয়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে বেজপাড়ার মৃত ইব্রাহিম গোলদারের ছেলে শামসুর রহমান ৪০৬/৪২০/৩২৩/৫০-৬/১৮৬০ পেনাল কোডের ধারায় এজাহার দেন। এভাবে ১২টি মামলা করা হয় ওই চক্রের বিরুদ্ধে। এরপর যশোরের বেজপাড়ার মৃত ইব্রাহিম গোলদারের ছেলে শামসুর রহমান উপরে উল্লেখিত ১৩ জনের নামে দুটি মামলা করেন। মামলা দুটি ৩ জন পুলিশ পরিদর্শক ও কয়েকজন এসআই প্রথমে তদন্ত করেন। মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন। এই সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র দম্ভোক্তি করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এরমধ্যেই আটক হয়েছে প্রতারক চক্রের শিরোমনি চেয়ারম্যান গালিব আহসান।

তথ্য মিলেছে, যশোরাঞ্চলে প্রতারণা করা এহসান এস ও রিয়েল এস্টেট অংশের চেয়ারম্যান জুনায়েদ আলী ও এমডি রবিউল ইসলাম ঢাকার মুজিবর রহমান নামে এক ধনকুপের সাথে লিয়াজো করে তাদের সম্পদ বিক্রি করছেন, আর ডজন খানেক এমডি পর্যায়ের প্রতারক এহসানের সব সম্পদ স্ব স্ব নামে করে নিচ্ছেন। মূল প্রতারকেরা এখন মহাসুখে ভাগবাটোয়ারায় লিপ্ত রয়েছেন। যে কারণে যশোরে এহসানের প্রতারণায় কয়েক হাজার গ্রাহক ধুকে ধুকে মরছেন, হতাশায় আর উৎকণ্ঠায় জীবনযাপন করছেন। আহাজারি কান্নাকাটি তাদের নিত্য দিনের সংগী। নিজের টাকা প্রতারকদের কাছে দিয়ে এখন ক্যান্সার ও প্যারালাইজডে পড়েও ওষুধ কিনতে পর্যন্ত পারছেন না। কান্না বিজিড়িত কণ্ঠে বালিয়া ভেকুটিয়ার আব্দুল মতিনের ছেলে শফিকুল ইসলাম, খড়কীর শামসুর রহমান, হামিদপুর এলাকার কামরুজ্জামান, রূপদিয়া এলাকার শের আলী, বারান্দীপাড়া এলাকার বিধবা আমিরুননেছা, কুলসুম বেগম, পুরাতন কসবা মিশনপাড়ার আফসার উদ্দিন, সীতারামপুরের আবুল কালাম, বালিয়া ভেকুটিয়া এলাকার মোহাম্মদ হানিফ, বারান্দীপাড়ার আমিনুন্নেছা, রাজারহাট এলাকার শাহাজাদী বেগম, বারান্দীপাড়ার আলেয়া বেগম, পূর্ববারান্দী মাঠপাড়ার নাছিমা খাতুন, একই এলাকার রায়হানুল ইসলাম, নাজির শংকরপুর এলাকার তরিকুল ইসলাম দ্রুত চক্রের সবাইকে আটক দাবি করেছেন। ফেরত চেয়েছেন তাদের টাকা। এ ব্যাপারে এহসানের ক্ষতিগ্রস্ত লগ্নিকারী সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক বারান্দীপাড়া কদমতলার মফিজুল ইসলাম ইমন জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৭ বছর প্রতারকদের ধরতে তারা মাঠে রয়েছেন। অনেক লগ্নিকারী রোগে শোকে ইতিমধ্যে মারাও গেছেন। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, আর বিছানায় কাতরাচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী লাগ্নিকারী। মানুষের বিশ^াসের সুযোগ নিয়ে ইসলামী আদর্শের সাথে বেঈমানী করে ৩শ’২২ কোটি ১২ লাখ ৭শ’৫০ টাকা পকেটে নিয়ে অধিকাংশ প্রতারক প্রকাশ্যেই ঘুরছে।

গালিব আহসানের সব সহযোগী মূফতি আবু তাহের নদভীসহ জড়িতদের দ্রুত আটক দাবি করেন তিনি। তিনি আরো জানান শ’ শ’ লগ্নিকারী ও তাদের পরিবারের লোকজন এখনও পথ চেয়ে আছেন ওই টাকা ফেরতের আশায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *