আমচাষিদের প্রত্যাশায় চিড় ধরাচ্ছে বৈশাখের তীব্র দাবদাহ

আসাদুজ্জামান আসাদ।৷ যশোরের শার্শা উপজেলায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র দাবদাহে আমের গুটি ঝরে পড়ছে; প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে পানি স্প্রে করেও কাজ হচ্ছে না,এতে আমের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

গত বছরের করোনা ও আম্পান ঝড়ের ক্ষতি পুষিয়ে এবার মৌসুমের শুরুতে বাম্পার ফলনের আশায় স্বপ্ন বুনেছিলেন এ অঞ্চলের আমচাষিরা। তবে তাদের সেই প্রত্যাশায় চিড় ধরাচ্ছে বৈশাখের তীব্র দাবদাহ।যশোর অঞ্চলে এখন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বয়ে যাচ্ছে।

যশোরের আম বাগানগুলোয় মুকুল বেশি আসায় এ বছর আম উৎপাদন রেকর্ড গড়বে বলে আশা করেছিলেন চাষিরা।কিন্ত তীব্র দাবদাহে আমের বোঁটা শুকিয়ে যাচ্ছে,প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে ছোটবড় আম। এভাবে টানা খরা চললে আমের ফলনে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আম চাষিরা।

শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৌতম কুমার শীল বলেন, শার্শা উপজেলায় এক হাজারেরও বেশি আম চাষি অন্তত তিন হাজার বিঘা জমিতে এবার আমচাষ করেছেন। হিমসাগর, লেংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, রুপালী ও মল্লিকা জাতের ২৭৫টি আমের বাগান আছে।

সৌতম বলেন,আমের গুটি ধরে রাখা, গুটি ঝরা বন্ধ করা ও গুটিকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষায় আমচাষিরা বিরামহীনভাবে পরিচর্যা করছেন।আমের কারবার নিয়ে এই অঞ্চলের ২০ হাজার মানুষের মৌসুমী কর্মসংস্থান হয়ে থাকে।

কুড়ি লাখ টাকা বিনিয়োগে সতেরটা আমবাগান কিনে বছর শেষে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা লাভের স্বপ্ন দেখছেন জামতলার আমচাষি গোলাম আজম।

তিনি বলেন, “এ বছর আম গাছগুলোতে প্রচুর গুটি আসায় এ অঞ্চলে আমের ‘বাম্পার’ ফলনের আশা করেলাম।”

কিন্ত তীব্র দাবদাহে বোঁটা শুকিয়ে গিয়ে আম ঝরে পড়ছে।পানি স্প্রে করেও আম গাছে ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমের উৎপাদন এবার অর্ধেকে নেমে আসতে পারে ধারণা করছেন তিনি।

নাভারনের আম ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর গাছে প্রচুর পরিমাণ মুকুল এসেলো,ব্যাপক গুটি ছিল। এ জন্নি লাভের আশায় বেশি দামে আম বাগান কিনেলাম। তবে এখন দেখছি খরার কারণে গাছ থেকে সমানে ঝরে পড়ছে আমের গুটি। এ নিয়ে রীতিমতো আমি শঙ্কিত।মনে হচ্ছে বিনিয়োগ করা টাকা এবার ঘরে ফিরবে না।’

বড়বাড়িয়া গ্রামের বাগান মালিক শাহাজান আলি বলেন,গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার আম গাছগুলোতে গুটি বেশি এসেছিল।বেশ কিছুদিন ধরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আমের বোঁটা আর গুটি ধরে রাখতি পারছে না।

শাহাজান বলেন, প্রথম দিকে বেশ ভালো দামে বাগান বিক্রি হলেও এখন যেভাবে আমের গুটি ঝরে পড়ছে তাতে লাখ টাকার বাগান ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

“তীব্র খরা ও দাবদাহে শুধু আম ঝরে পড়ছে তা নয়, কিছু কিছু আমে পচনও দেখা দিয়েছে” বলেন বারিপোতা গ্রামের আমচাষি দেলোয়ার হোসেন।

সামটা গ্রামের আমচাষি লাল্টু গাজি বলেন, “আম ঝরে পড়া রোধ করতে পানি, স্প্রে ও বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, কিন্ত এতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না।”

খোরশেদ আলম,আকবর আলি,গোলাম আজম,শাহাজান কবির,লাল্টু গাজি, জহুরুল হক,দেলোয়ার হেসেনসহ একাধিক আমচাষি ও ব্যবসায়ী বলেন, অন্যান্য বছরের মতো এবারও তারা প্রতিটি বাগান মালিককে অগ্রিম ৩০-৪৫ হাজার টাকা দিয়ে এক বিঘার একটি করে বাগান কিনেছেন।পরিচর্যায় বিঘা প্রতি আরো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

অন্য বছর এক বিঘার একটি বাগান থেকে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। বিঘা প্রতি এক লাখ টাকা পর্যন্ত আম বিক্রি হয়েছে তবে এবার যে অবস্থা তাতে আম ছালা দুটোই যাবে বলে মনে করছেন এই আম চাষিরা।

সাতমাইল মেঠোপাড়া গ্রামের বাগান মালিক ইউনূছ আলি বলেন, প্রতিবছর আমের মুকুল দেখে লাভের আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু নানা কারণে মুকুল ঝরে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত লাভ তেমন একটা হয় না।

‘আর এবার খরায় আমের গুটি ঝরে পড়ছে। বৃষ্টি হলে আমগুলো রক্ষা পেত।তারপরও গাছের গোঁড়ায় পানি দিচ্ছি। কিন্তু আবহাওয়া এত গরম যে লাভ তেমন একটা হচ্ছে না। আমের জন্য এই মুহূর্তে একটা ভাল বৃষ্টি দরকার বলেও জানান এই চাষি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *