রোহিঙ্গা শিবিরে করোনা আর পাহাড়ধস ভীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার : বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য প্রতি বছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়ে আসছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সারা বিশ্বের শরণার্থীদের টিকে থাকার সংগ্রামকে স্মরণ ও সম্মান জানাতে কক্সবাজারের মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো দিনটি একসঙ্গে পালন করে। কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গাদের ৮০ শতাংশই নারী এবং শিশু। ভয়াবহ নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে দীর্ঘ, বিপজ্জনক ও কঠিনপথ পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সুরক্ষার আশায় আশ্রয় নেন। শুরু থেকেই স্থানীয় জনগণ যে উদারতা দেখিয়েছেন তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) অংশীদার জাতিসঙ্ঘ ও এনজিওগুলো সহস্রাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষায় প্রতিদিন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আইএসসিজির সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর নিকোল অ্যাপটিং বলেন, অংশীদাররা মানবিক সহায়তাগুলো আরও উদ্ভাবনী উপায়ে সম্পৃক্ত করার জন্য শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং সহায়তা যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায়, দায়িত্বের বোঝা ভাগ করে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ মহামারির এ চ্যালেঞ্জিং সময়টি যখন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাতের কারণে যারা সবকিছু হারিয়েছেন তাদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দিতে, আমরা সমগ্র বিশ্বের সরকার ও সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এদিকে করোনা সংক্রমণের বড় ঝুঁকির পাশাপাশি আষাঢ়ের শুরু থেকে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কার মধ্যেই বসবাস করছে বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের বৃহত্তম ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গারা। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থান করা প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে দেড় লাখের বেশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এ দিকে, চলতি বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা নিবন্ধন কার্যক্রম কিছুটা গতি পেলেও মহামারিতে তা আবারো বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রমও। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় এবং জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নতুন নিবন্ধন কার্যক্রমে এ পর্যন্ত আট লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। নানা ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বলা হলেও বাস্তবে গত তিন বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছর মহামারি পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার বাস্তবতার মধ্যে গতকাল শনিবার ২০ জুন পালিত হয়েছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সংকট নিরসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরিভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মিয়ানমার বারবার বলেছে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরিসহ যেসব উদ্যোগ নেওয়া দরকার সেসব নিচ্ছে না। বরং রাখাইনে বর্তমানে শুধু রোহিঙ্গা নয়, অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষে এ বোঝা আর বহন করা সম্ভব হচ্ছে না এ বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

ক্যাম্পে করোনা পরিস্থিতি : কক্সবাজারের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শামসুদ্দোজা নয়ন জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৪০ জন রোহিঙ্গা করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্যাম্পে করোনা প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৩০০ বেডের দুটি আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। আরও ২০০ বেডের আইসোলেশন সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে।

পাহাড়ধসের আতঙ্ক : বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই গত কয়েক দিনের অতিবর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ব্যাপক পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের বর্ষার অভিজ্ঞতা এবার আরও বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত বছর পাহাড়ধসে রোহিঙ্গাদের প্রায় পাঁচ হাজার বসতঘরের ক্ষতি হয়। চলতি বছরও অব্যাহত বর্ষণের কারণে ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা পাহাড় ধস ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাতা সংস্থাগুলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *