বেনাপোলের হাকর নদী দখলবাজদের দখলে ‘দে রে দে মরা গাঙ্গে নাও ভাসাইয়া দে’

বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংযোগ বেনাপোলের ‘হাকর নদী’ এখন দখলবাজদের দখলে। ভূমি অফিসের এক শ্রেনির অসাধু কর্মকর্তার জোকসাজসে নদীকে ‘সমতল ভূমি’ দেখিয়ে কৌশলে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ।
নদীর নাম হাকর। হাকর নদী ভারত ও বাংলাদেশের দুটি অংশেই বিদ্যমান। ওপারের ইছামতি নদীর শাখা এই হাকর নদী। ১৯২৭ সালের রেকর্ডে নদীটির অস্তিত্ব মিললেও বর্তমানে নদীটির কোন খোঁজ মিলছেনা। ব্যক্তি মালিকানায় দখল করে নদীর জায়গায় ভবন, মাছ চাষের ঘের ও পুকুর করা হয়েছে। তবে ভারতে নদীটির অস্তিত্ব রয়েছে।
যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলার বেনাপোলের সাদিপুর গ্রামে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের ১৮ নম্বর সীমানা পিলার এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে হাকর নদী। শার্শার বড়আঁচড়া, ছোট আচড়া, ভবারবেড়, বেনাপোল ও নারানপুর মৌজার মধ্য দিয়ে রঘুনাথপুরের কোদলা নদী হয়ে বেতনা নদীর সাথে মিশে গেছে। বেতনা শার্শার নাভারন থেকে ১৯৬ কিলোমিটার দক্ষিনে মরিচাপ নদীতে মিশেছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অংশে হাকর নদীর কোন অস্তিত্ব নেই। নদীর বুকে গড়ে উঠেছে একাধিক আলীশান ভবন ও নানা স্থাপনা। খনন করা হয়েছে অনেকগুলো পুকুর। ভারতের অংশে নদীটি এখনো বেঁচে আছে।
ওপারে ভারতের পেট্রাপোলে বাংলাদেশে প্রবেশমুখে বেড়ীবাঁধ দিয়ে পানি চলাচল নিয়ন্ত্রনে রেখেছে ওরা । বর্ষাকালে পানির চাপ হলে বাঁধ খুলে দেয় তখন বেনাপোল সীমান্তের এপাশে ভারতীয় পানির চাপে প্রতিবছর বন্যার সৃষ্টি হয় বলছেন স্থানীয়রা ।
বেনাপোল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোল্যা বলেন, জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ২০ (২ক) ধারা মোতাবেক হাকর নদী সরকারের ১ নম্বর খতিয়ানে রেকর্ড হওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকর্তা নদীর জমিকে সমতল ভূমি দেখিয়ে কৌশলে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করে দিয়েছেন।
গ্রামের সংবাদকে আবু সাঈদ বলেন, কুমুদিনী দাসী ও সূর্যকান্ত রায় চৌধুরী নামে দুইজন জমিদার হাকর নদীর জমির স্বত্ব দখলীয় হিসেবে ছিলেন।
পরে এর স্বত্ব সরকারের কাছে চলে যায় । ১৯২৭ সালের সিএস রেকর্ডেও তা সরকারের নামেই ছিল। কিন্তু ১৯৬২সালের এসএ জরিপে দেখা যায়, ছোটআঁচড়া মৌজার ১ নম্বর দাগে ৮ দশমিক ১৩ একর, বড়আঁচড়া মৌজার ১ নম্বর দাগের ৫ দশমিক ৬০, ভবারবেড় মৌজার ১ নম্বর দাগের ৪ দশমিক ২৩ ও বেনাপোল মৌজার ১, ৩৭২ ও ৪১১ নম্বর দাগে ২৪ দশমিক ৩৯ একর জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। এই ভাবে স্থানীয় ৩০০-৩৫০ ব্যক্তি বর্তমানে নদীর জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করে ভোগ-দখল করছেন।


বেনাপোল পৌর আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও লায়ন আলীকদর সাগর বলেন, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে হাকর নদীটি দখলমুক্ত করতে সরকারী প্রকল্প শুরু হলেও পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের মন্ত্রী, এমপিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নদীটি দখলমুক্ত করে ‘লেকসিটি’ নির্মাণের পরিকল্পনায় কয়েক দফা পরিদর্শন করেছেন।
কদর বলেন, স্থলবন্দর বেনাপোলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নদীটি দখলমুক্ত করার বিকল্প নেই। আন্ত:সীমান্ত সংলগ্ন নদীটি দখলদারদের কারনে নাব্যতা হারিয়েছে।
এতে পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর শার্শা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
বেনাপোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলুর রহমান বলেন, স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী অসৎ উপায়ে আরএস রেকর্ডে হাকর নদীর সরকারি জমির মালিক হয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী হাকর নদী আবারো দখলমুক্ত করা হোক এ দাবি এখন বেনাপোলবাসীর।
“নাভারনের বেতনা নদীর সঙ্গে বেনাপোলের হাকর নদীর সংযোগ বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত পানির চাপে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাঠের ফসল ও বাড়িঘর।”
ভারত সীমান্ত থেকে বেনাপোল পৌর ভবন পর্যন্ত হাকর নদীকে দখলমুক্ত করে পৌরবাসীর জন্য একটি সরোবর (লেক) তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, হাকর নদী উন্মুক্তকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ের আদেশের অপেক্ষায় আছি। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে শার্শার বাহাদুরপুরের বিপরীতে ভারতের শুটিয়ায় ফারাক্কার আদলে একটি বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অতিরিক্ত পানির চাপ এলেই ভারত সেই বাঁধ খুলে দেয়। এতে বর্ষা মৌসুমে শার্শার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মঞ্জু বলেন, বাংলাদেশ অংশে হাকর নদী অবৈধ দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। অথচ ভারতের অংশে নদীটি স্বাভাবিকভাবেই প্রবহমান আছে। সিএস রেকর্ডের মালিকানা ধরে নদীটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
শার্শা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মৌসুমী জেরিন কান্তা বলেন, অবৈধ দখলদারদের কারণে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে হাকর নদী। নদীটি এখন নিখোঁজ বললেই চলে। সরকারি জমি কখনই ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হওয়ার সুযোগ নেই। তখনকার সময় সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বর্তমান দখলদাররা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। হাকর নদী দখলমুক্ত করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মন্ডল বলেন, হাকর নদীর দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মামলার বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *