চৌগাছায় কপোতাক্ষের বেহাল দশা, প্রতিকার চাই সরকারের কাছে

আব্দুল আলীম, চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধিঃ যশোরের চৌগাছার কপোতাক্ষ নদ এক অতীত ঐতিহ্য। যা মিশে আছে বাঙালীর অন্তর থেকে অন্তরে। কবি-লেখকের লেখনীর ছোয়াতে। আজও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা স্মরণ করে এই কপোতাক্ষ নদকে। এই নদ ছুয়েছিলো মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। যার লেখনীর ছোয়ায়, যার মনের আবেগে, বিদেশে থেকেও যিনি ভুলতে পারেননি বাঙালীর ঐতিহ্যময়ী বাংলাকে, ঐতিহাসিক এই কপোতাক্ষ নদকে। কিন্তু কপোতাক্ষ নদ হয়ে দাড়িয়েছে এখন মরা খাল, দ্রুত খনন চায় চৌগাছা উপজেলার সর্বস্তরের জনগন।

চৌগাছা উপজেলা সদরের উপর দিয়ে বয়ে চলা বিখ্যাত কবি মাইকেল মধুসুধন দত্তের কপোতাক্ষ নদ এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে, দেখার যেনো কেউ নেই। নেই সংস্কারের উপায়ন্তু পথ। সরকারের এই ক্ষেত্রে নজর নেই বলেই সাধারণ জনগণের ধারণা।

এক সময় এই নদে স্রোত ছিলো অনেক, প্রায় জোয়ার- ভাটা দেখা যেতো। কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মহেশপুর অঞ্চলের লোকজনের একমাত্র ব্যবসা মাধ্যম ছিলো এই নদ। ফলে এই কপোতাক্ষ নদকে ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার মান ও উন্নত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে তা হয়ে পড়েছে বিপরীত।

বর্তমানে কপোতাক্ষ এই নদকে ঘিরে বেড়ে যায় অবৈধ দখল, প্রতিযোগিতার বহর বাড়িয়ে দিয়েছে দখলকারীর সংখ্যা। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা এই কপোতাক্ষ নদটি ধিরে ধিরে দখল হয়, আর হারাতে থাকে তার যৌবন।

বিভিন্ন ময়লা আবর্জনা ও দূষণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই নদী। চৌগাছার যতো ময়লা আবর্জনা সব ফেলা হয় এই নদীতে।

আর দীর্ঘ দিন খনন না করার ফলে পলি জমে ভরাট হয়ে কপোতাক্ষ এই নদটি মরার আগেই মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বেশ কয়েক বছর আগে এই অঞ্চলের কৃষকরা এই নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতো, কম খরচে সেচের পানি পেয়ে কৃষকরা কৃষি কাজে খরচ কমাতো। এখন নদীতেই পানি নেই তো কৃষকরা অার পানি কোথায় পাবে। ফলে বেশি দামে পানি কিনে কৃষকরা ফসলের সেচ কাজ সারছেন।
এছাড়া এই কপোতাক্ষ নদের পাশ ঘিরে রয়েছে উপজেলার ধূলিয়ানী ইউনিয়ন। ইউনিয়নের কাবিলপুর, মুকুন্দপুর, ধূলিয়ানী, মুক্তারপুর, উজিরপুর গ্রামগুলোর অবাস্থান এই নদের পাশ ঘেষে। কথা হয় ধূলিয়ানী বাজারের টেইলার্স ব্যবসায়ী ইমামুল হোসেনের সাথে। তিনি খুব কষ্ট নিয়ে কপোতাক্ষ নদ সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। তিনি বলেন, আমার দোকান এই নদের গা গেষে অবস্থিত। আমার বয়স যখন ৭-৮ বছর তখনকার কথা ভুলার নয়। ভুলার নয় এই কপোতাক্ষের ঐতিহ্যের কথা। আমি দেখেছি, এই নদে লঞ্চ বেয়ে ঝিকরগাছা এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল ধূলিয়ানী বাজারে আনতো। তিনি আরও বলেন, চৌগাছায় কপোতাক্ষ নদ ঘেষে বাংলাদেশের একটি বৃহৎ বলু দেওয়ানের মেলা হয়। যেখানে অতীতে লোকজন ঝিকরগাছা ও তার সংলগ্ন এলাকা থেকে নদীপথে অবস্থান করতো। নদের চেহারা ছিলো পানি থৈ থৈ অবস্থা। নদের যত সৌন্দর্য দরকার সবই যেনো তখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিলো। কত ভালো লাগতো। দুপুর হলে কবির ভাষায় মুখরিত ছিলো নদের কূল। গ্রাম/শহর যায় বলেন সেই গায়ের বধু, ছেলে, বুড়ো সকলের গোসলের সমারহ চলতো দুপুরে। আর আজ এই নদের প্রাণ নেই বললেই চলে। মরে গেছে তার রূপ। বিঘ্ন হচ্ছে জেলেদের জীবন। বর্ষাকালে হঠাৎ মনে হয় বন্যা আসছে। বর্ষা যেতে না যেতেই দেখা যায় নদের শুকনা অবস্থা। শুকিয়ে চর পড়ে যায় সারা নদ। হেটে হেটে এপার থেকে ওপার যাওয়া যায়। এক কথায় আমাদের এলাকায় নদে পলি জমে, পাড় ভেঙে ভরাট হয়ে গেছে। গভীরতা নেই মোটেই। সরকার যদি ইচ্ছা করে তবে কপোতাক্ষ নদ খননের মাধ্যমে নদের এই দৈন্য অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। এই জন্য আমরা এলাকাবাসী সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মুক্তি চাচ্ছি, উন্নয়ন চাচ্ছি এই কপোতাক্ষ নদের। ফিরে পেতে চাচ্ছি বাংলা মায়ের আনন্দময়ী পরিবারকে। যেখানে থাকবে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, নদী ভরা জল।

সমগ্র চৌগাছাবাসী এই কপোতাক্ষ নদকে বাঁচাতে, বাঙালীর ঐতিহ্যকে বাঁচাতে সর্ব মহলের দৃষ্টি আকর্ষন করছে । অতিদ্রুত এই নদটির যে অঞ্চল অবৈধ দখলকারীদের হাতে রয়েছে সেটা মুক্ত করাসহ সমগ্র নদের খনন কাজ সম্পন্ন করা না হয় তবে কপোতাক্ষ নদ থাকবে, নদের উপরে বিভিন্ন এলাকায় ব্রিজ থাকবে বইয়ের ইতিহাসের পাতায় বাস্তবে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *